‘পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?’ ইন্টারভিউ বোর্ডের এই চিরাচরিত প্রশ্নের বিপরীতে এক প্রার্থীর সংক্ষিপ্ত অথচ মর্মস্পর্শী উত্তর—‘স্যার, আপাতত আগামী মাসের মেসভাড়াটা দিতে পারলেই আমি খুশি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কৌতুকটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও, এর হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে দেশের লাখো উচ্চশিক্ষিত তরুণের করুণ ও রূঢ় বাস্তবতা। ডিগ্রি অর্জনের পর দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত স্বপ্ন দেখার চেয়ে প্রতি মাসের টিকে থাকার ন্যূনতম খরচ জোগানোই এখন অনেক তরুণের প্রধান চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের গাণিতিক প্রমাণ পাওয়া যায়। সরকারি তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে দেশে চাকরিহীন গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। বিপরীতে একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, যাঁদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাঁদের মধ্যে বেকারত্বের হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ডিগ্রি যত বাড়ছে, বিপরীতে বেকার থাকার ঝুঁকিও তত বেশি তৈরি হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান শুধু কাগুজে সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রতিদিনের যাপিত জীবনকে পিষ্ট করছে হাজার হাজার মেধাবী তরুণের।
এই বাস্তবতারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ পুরান ঢাকার নারিন্দার এক মেসে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আসিফ। স্নাতক শেষ করার দুই বছর পার হয়ে গেলেও তাঁর প্রতিটি দিন কাটে চাকরি খোঁজা আর মেসভাড়ার দুশ্চিন্তায়। ঢাকার অন্য প্রান্তে রাজাবাজারের মেসে থাকা তানভীরের সংকট আবার যাতায়াত খরচ ও যাপিত জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ জোগানো নিয়ে। অন্যদিকে, রংপুরের বাড়ি থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করে পরীক্ষা দেওয়া রনির পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। তাঁর দুই মাসের মেসভাড়া বাকি, আর স্থানীয় মুদিদোকানের বাকির খাতায় তাঁর নাম এখন নিয়মিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসিফ, তানভীর কিংবা রনি কেবল তিনজন ব্যক্তি নন, বরং তারা দেশের লাখো বেকার যুবকের প্রতিনিধি মাত্র।
প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গড়ে প্রায় সাত লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও শ্রমবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র তিন লাখের মতো। সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রিলিমিনারি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিসিএস বা ব্যাংক সমন্বিত চূড়ান্ত নিয়োগ সুপারিশ পেতে একজন প্রার্থীর গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার কারণে বেসরকারি খাতে প্রবেশ করতে গেলেও বয়স ও অভিজ্ঞতার বড় বাধা তৈরি হয়।
শিক্ষাব্যবস্থার অর্জিত সনদের সঙ্গে বর্তমান চাকরি খাতের চাহিদার অমিলকে অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক। তিনি মনে করেন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে মিডিয়া থেকে শুরু করে হিসাবরক্ষণ—নানা ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। তবে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কাজের সুযোগ টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যতে এর ব্যাপক চাহিদাও তৈরি হবে। তাই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দেশের কারিগরি শিক্ষাকে উন্নত করতে হবে এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে তরুণদের এই সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করে কেবল নির্দিষ্ট কিছু সরকারি বা বড় করপোরেট চাকরির পরীক্ষার পেছনে তিন থেকে চার বছর মূল্যবান সময় ব্যয় করছেন। এই আড়ষ্টতা কাটাতে পড়াশোনা চলাকালে বা শেষ হওয়া মাত্রই যেকোনো শিক্ষানবিশ কাজ, পার্টটাইম চাকরি কিংবা স্কিল–বেজড প্রজেক্টে যুক্ত হওয়া জরুরি। যেকোনো ধরনের কাজ শুরু করলে কাজের প্রতি অনীহা কাটে, যা পরবর্তী সময়ে বড় ক্যারিয়ারের দরজাও খুলে দেয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সূচকে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের মতে, উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে প্রতিবছর দেশের কোটি কোটি মানবসম্পদ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের এভাবে দীর্ঘ সময় বেকার বসে থাকার ফলে বাংলাদেশ তার গুরুত্বপূর্ণ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশের সুবিধা হারাচ্ছে। এর ফলে জাতীয় জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে বছরে আনুমানিক কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে।
পেশা বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিগত সংস্কার ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি হলেও, আপাতত দেশের হাজার হাজার মেসে তরুণদের দিন কাটে প্রতি মাসের টিকে থাকার লড়াইয়ে। মেসভাড়ার খাতা আর নিয়োগ পরীক্ষার আবেদনপত্রের ফির হিসাব মেলাতে গিয়ে পুরো এক প্রজন্মের মেধা ও যৌবনের বড় অংশ থমকে থাকছে অনিশ্চয়তার এক অন্তহীন চক্রে।











