কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার এক নির্জন জঙ্গলে শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। কেবল একটি দামী আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার লোভে এই নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হয় বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি জানান, অপ্রতীমের নিখোঁজ হওয়ার পর প্রাপ্ত জিডির ভিত্তিতে পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের আনুমানিক দুপুর ২টা থেকে সোয়া ২টার দিকে তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা নামক স্থানে যায়। এলাকাটি চারপাশ পাহাড়ঘেরা এবং অত্যন্ত নির্জন একটি জঙ্গল।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজ আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এর ফলে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার আগেই সন্দেহভাজন তুহিনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে চালানো জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন স্বীকার করে যে, অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার পূর্বপরিকল্পনায় সে তাকে ওই নির্জন জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিল। তুহিন আরও জানায়, এই অপরাধে তার সঙ্গে ফাহাদ এবং ফাহাদের এক বন্ধু জড়িত ছিল।

তুহিনের এই স্বীকারোক্তির পরপরই পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করে ফাহাদকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে ফাহাদ স্বীকার করে যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার আরেক বন্ধু কামরুলও সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে কামরুলকেও হেফাজতে নেয়।

তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ সুপার জানান, আইফোনটি উদ্ধারের বিষয়ে তুহিন প্রথমে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এবং ভুল তথ্য দেয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তিনটি ভিন্ন স্থানে অভিযান চালালেও ফোনটি পাওয়া যায়নি। অবশেষে তুহিনের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার দেখানো তথ্যের ভিত্তিতে তার নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নিখোঁজ আইফোনটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে সানন্দার নির্জন বনের ভেতরে অপ্রতীমের আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অপ্রতীম এতে বাধা দিলে আসামিদের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে। অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা আইফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যায়।

এই ঘটনায় পুলিশ সিয়াম নামে আরও একজনকে আটক করেছে। তার বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। জেলা পুলিশ সুপার আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে ইতোমধ্যে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য পুরোপুরি উদ্ঘাটন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশ প্রতিবেদন বা চার্জশিট বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করা হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আদালত যেন এই মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি করে। লামিসা হত্যা মামলায় যেভাবে দ্রুত রায় এসেছে, এই মামলাটিও যেন সেই আদলে দ্রুত বিচার করা হয়, সেজন্য পুলিশ আদালতের কাছে আবেদন জানাবে।