অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিনগুলোর কিছু বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই অধ্যাপক তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শুক্রবার (২ অক্টোবর) এক পোস্টে তুলে ধরেন শপথ গ্রহণের পরবর্তী সময়ের কিছু ব্যক্তিগত ও পেশাগত টানাপোড়েনের কথা।

শপথ গ্রহণের পরদিন থেকে শুরু হওয়া সেই অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. আসিফ নজরুল প্রথমে উল্লেখ করেন পুলিশ মোতায়েনের বিড়ম্বনার কথা। তিনি জানান, দীর্ঘকাল ধরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ফুলার রোডে বসবাস করছিলেন এবং উপদেষ্টা হওয়ার পরও সেখানে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট শপথ গ্রহণের পর যখন তিনি ফুলার রোডের বাসায় ফিরে আসেন, তখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তাঁর বাসাটি তিনতলায় অবস্থিত। সিঁড়িঘরে গিয়ে তিনি দেখতে পান পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য মনমরা হয়ে বসে আছেন। তবে তাঁকে দেখামাত্রই তারা প্রবল উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ান এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে সালাম জানান। ড. আসিফ নজরুলের মতে, সেই সালামের ধরন ছিল অনেকটা স্যালুটের মতো। স্যালুট দেওয়ার তাড়াহুড়োয় একজনের কাঁধ থেকে রাইফেলটি খসে পড়ে। পুলিশ সদস্যদের সেই করুণ ও বিপর্যস্ত দশা দেখে তাঁর মনে গভীর মায়া জাগে।

বাসার ভেতরে প্রবেশের পর তিনি দেখতে পান সেখানে অপরিচিত মানুষের ভিড় জমেছে। একেকজনের একেক রকম দাবি-দাওয়া। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, মনে হচ্ছিল সেই রাতেই সব দাবি পূরণ না হলে হয়তো বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে যাবে। সারাদিনের ক্লান্তি আর মানসিক চাপে বিধ্বস্ত হয়ে গভীর রাতে ঘুমাতে গেলেও পরদিন ছুটির দিনেও তিনি অফিস করার সিদ্ধান্ত নেন।

পরদিন সকাল ৮টায় অ্যালার্ম শুনে ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুত হওয়ার সময় হঠাৎ তীব্র শব্দে ডোরবেল বেজে ওঠে। দরজা খুলতেই সামনে হাজির হন ফুলার রোডেরই এক দীর্ঘদেহী তরুণ, যার চুল ছিল বেশ উঁচিয়ে রাখা—একেবারে বর্তমানের ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য। ড. আসিফ নজরুলের কাছে পাড়ার সব ছেলে-মেয়েই সন্তানের মতো, তাই কিছুটা বিরক্ত হলেও তিনি দরজা খোলেন। তবে সেই তরুণ কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘আঙ্কেল, আপনার বিল্ডিংয়ের সামনে পুলিশ কেন?’ উপদেষ্টা যখন বিনয়ের সাথে ব্যাখ্যা করেন যে, পুলিশ তিনি নিজে চাননি বরং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের মোতায়েন করা হয়েছে, তখন তরুণের মন গলেনা। বরং বিরক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘পুলিশ সরান আঙ্কেল। পুলিশ দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়, জ্বালায় দিতে ইচ্ছে করে।’

শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের সেই তরুণের মুখে এমন আক্রমণাত্মক কথা শুনে ড. আসিফ নজরুল হতবাক হয়ে যান। সেই তরুণ ক্ষোভের সাথে বলতে থাকেন, ‘আমরা হাসিনাকে সরাইছি, পুলিশ আমাদের গুলি করে মেরেছে। চোখের সামনে পুলিশ দেখলে কেমন লাগে, বুঝেন না আঙ্কেল!’

পরবর্তীতে ড. আসিফ নজরুল জানতে পারেন, ওই তরুণ জুলাই গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে বিস্ময়ের বিষয় ছিল, তরুণের বাবা জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে ছিলেন এবং এমনকি শিক্ষকদের সমাবেশের অগ্রভাগে তাঁর ছবিও দেখা গিয়েছিল। ড. আসিফ নজরুল তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘এমন বাবা থাকলে হয়তো সন্তানকে বেশি করে চেতনা দেখাতে হয়। একজনের চেতনা অন্যদের খুব দ্রুত প্রভাবিত করে।’

শেষ পর্যন্ত ড. আসিফ নজরুল উপলব্ধি করেন যে, ফুলার রোডে তাঁর থাকা আর সম্ভব নয়। একদিকে পুলিশ সদস্যদের মলিন চেহারা আর বিপন্ন অবস্থা, অন্যদিকে স্থানীয় তরুণ প্রজন্মের তীব্র ক্ষোভ—এই দুইয়ের মাঝে পুলিশ সদস্যরা আরও বড় বিপদে পড়তে পারেন। তাই পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তিনি অত্যন্ত কষ্ট সাথে সাথে ফুলার রোডের বাসা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং মন্ত্রিপাড়ায় নতুন বাসার খোঁজ শুরু করেন।