চট্টগ্রামের অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখার ক্যাশ ভল্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ভল্টে প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে, যা মূলত বিভিন্ন গ্রাহকের আমানত করা অর্থ। এই গুরুতর আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের করা একটি মামলায় শাখাটির সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জাফরুল্লাহ তানভীরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার এজাহারে কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরের পাশাপাশি আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংকের এই লালদীঘি পূর্ব করপোরেট শাখাটি সম্প্রতি এক বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত বুধবার (১২ আগস্ট) শাখাটির জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে নগরের কোতোয়ালি থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, মো. কামরুল হোসেন ওই শাখার ক্যাশ এবং ভল্টের সামগ্রিক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। গত ৯ আগস্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং নিয়মিত লেনদেন শেষ হওয়ার পর যখন নগদ অর্থের হিসাব এবং ভল্টে সংরক্ষিত অর্থের পরিমাণ মেলানো হয়, তখন সেখানে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে। পরবর্তীতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হিসাব-নিকাশ, ভল্টের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সকল নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতির কথা নিশ্চিত হয়।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘাটতির বিষয়ে যখন ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেনের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়, তখন তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। এর পরপরই ব্যাংকের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, জাফরুল্লাহ তানভীরসহ আরও কয়েকজনের সহযোগিতায় কামরুল হোসেন ব্যাংকের ভল্ট থেকে এই বিপুল অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন এবং তা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক অদ্ভুত কৌশল; কামরুল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় জানা যায়, ভল্টে টাকা জমা দেওয়ার সময় তিনি এক হাজার টাকার বড় বান্ডিলের ভেতরে কৌশলে ১০০ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের ছোট নোট ঢুকিয়ে বান্ডিল সাজাতেন। ফলে বাইরে থেকে বান্ডিলগুলো দেখে মনে হতো ভল্টে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অর্থের পরিমাণ ছিল অনেক কম। এই কৌশলের মাধ্যমেই দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকের নজরদারি এড়িয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, সরিয়ে নেওয়া এই অর্থ জাফরুল্লাহ তানভীরের তত্ত্বাবধানে বিনিয়োগ করে হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত এগ্রো’ নামে একটি গরুর খামারের কার্যক্রম শুরু করা হয়। বর্তমানে ওই খামারে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে, যা এই আত্মসাতের অর্থের বিনিয়োগের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই ঘটনায় পুলিশের মনে বড় প্রশ্ন জেগেছে—কেন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বিপুল অংকের ঘাটতি ধরা পড়েনি? ব্যাংকের ভল্টের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থানে নিয়মিত হিসাব ও তদারকির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে এই অনিয়ম চলল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার মো. হাবিবুর রহমান জানান, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের করা মামলার প্রেক্ষিতে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে তদন্ত চালানো হচ্ছে। তবে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নুর এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্যে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে, মামলার দ্বিতীয় আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ ব্যাংকের এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তার ছেলে কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা বা কর্মচারী নয় এবং অগ্রণী ব্যাংকের ওই শাখার গ্রাহকও নয়। তিনি আগে থেকেই গরুর খামারের ব্যবসা করে আসছিলেন, তাই তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন। আজিম উল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট রাত ১টার দিকে তার স্ত্রীর মোবাইলে ব্যাংক থেকে ফোন করে জানানো হয় যে, তার ছেলে লালদীঘি ব্যাংকে আটক আছে। কিন্তু কত টাকা বা কী কারণে আটক, তা পরিষ্কার করা হয়নি এবং ছেলের সাথে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তার দাবি, ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেনই অন্যদিনের মতো তার ছেলেকে ফোন করে ব্যাংকে ডেকে নিয়েছিলেন। ওই রাতেই আত্মীয়স্বজন নিয়ে ব্যাংকে গেলেও তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে পুলিশ সহায়তায় রাত ২টার দিকে ব্যাংকে প্রবেশ করে পুলিশ তার ছেলে এবং কামরুল হোসেনকে থানায় নিয়ে যায়। আজিম উল্লাহ আরও দাবি করেন, তার ছেলে আগে থেকেই খামারের ব্যবসা করত এবং কামরুল হোসেন মাঝেমধ্যে ব্যবসায়িক লাভসহ টাকা লেনদেন করতেন, কিন্তু ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা নেওয়া বা আত্মসাতের কোনো প্রমাণ তাদের দেখানো হয়নি।

এই পুরো ঘটনা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের আইনজীবী শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, একটি ব্যাংকের ভল্টে কোটি কোটি টাকা সংরক্ষিত থাকে এবং সেখানে বহিরাগত কারো প্রবেশ করে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়। তাই ভল্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চাবির অ্যাক্সেস, ক্যাশ গণনা পদ্ধতি, দৈনিক হিসাব এবং সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি এক বছরের বেশি সময় ধরে এই ঘাটতি থেকে থাকে, তবে শাখা ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি কর্মকর্তারা কেন তা জানতে পারেননি? যেহেতু এখানে সাধারণ অর্থ নয় বরং গ্রাহকদের আমানত জড়িত, তাই এই গাফিলতির দায়ভার কে নেবে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।