শেখ মাহতাব হোসেন
বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের খাল ও নদীর পাড়ে তাকালেই চোখে পড়ে থোকা থোকা সবুজ রঙের ফল। গোল গোল ডুমুরের মতো দেখতে এ ফলটিই উপকূলীয় মানুষের অতি পরিচিত ‘কেওড়া’ (বৈজ্ঞানিক নাম: Sonneratia apetala)। সুন্দরবনের হরিণ ও বানরের অন্যতম প্রধান ও প্রিয় এই খাদ্যটি কেবল বন্যপ্রাণীর আহারই নয়, বরং মানবদেহের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর, ঔষধিগুণ সম্পন্ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় এক প্রাকৃতিক সম্পদ।
সরেজমিন সাক্ষাৎকার: বাওয়ালি থেকে গবেষকের চোখে কেওড়া
কেওড়া ফলের স্বাদ, ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যগত দিক বুঝতে আমরা কথা বলেছি সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার অভিজ্ঞ বাওয়ালি (বনজীবী) এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকের সঙ্গে।
বনজীবী রহিম শেখের অভিজ্ঞতা (আড়পাংশিয়া, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা):
কেওড়া ফল সংগ্রহের উপযুক্ত সময় কখন এবং স্থানীয়দের মধ্যে এর ব্যবহার কেমন?
গোলাম মোস্তফা"ফাল্গুন মাসে গাছে ফুল আসে, আর আষাঢ় থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বন থেকে আমরা পাকা কেওড়া সংগ্রহ করি। এই সময় বনজুড়ে হরিণ আর বানরের কেওড়া খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আমরা স্থানীয়রা কাঁচা কেওড়া ফল দিয়ে ছোট চিংড়ি মাছ রান্না করি, মসুরের ডালে টক হিসেবে দিই, কিংবা চাটনি ও আচার বানাই। গরমের দিনে কেওড়ার টক খেলে শরীর নিমেষেই ঠান্ডা হয়ে যায়, পেট খারাপ বা বদহজমও একদম দূর হয়ে যায়।"
গবেষক ড. শেখ জুলফিকার হোসেন (অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়):
গবেষণায় কেওড়া ফলের কী কী পুষ্টিগুণ ও ঔষধি ক্ষমতা উঠে এসেছে?
ড. জুলফিকার হোসেন: "আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়া ফলের পুষ্টিগুণ আপেল বা কমলার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এতে প্রায় ১২% শর্করা, ৪% আমিষ ও প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে। দেশীয় ফলের মধ্যে আমলকীর পরেই সবচেয়ে বেশি রোগপ্রতিরোধী ‘পলিফেনল’ পাওয়া যায় এই কেওড়া ফলে।"
এটি কোন কোন রোগ প্রতিরোধে কার্যকর?
ড. জুলফিকার হোসেন: "এটি ডায়াবেটিস ও ডায়রিয়া প্রতিরোধী এবং এতে ব্যথানাশক গুণাগুণ রয়েছে। কেওড়া ফলে থাকা আয়রন, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও জিঙ্ক শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ঘাটতি পূরণ করে ক্যানসার, হৃদরোগ ও বিভিন্ন প্রদাহজনিত ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য কর
পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা
কেওড়া গাছ সুন্দরবনের একটি ‘অগ্রগামী বৃক্ষ’ (Pioneer Plant)। নতুন জেগে ওঠা চরে জোয়ার-ভাটার লবণাক্ততার সঙ্গে যুদ্ধ করে সবার আগে এই গাছ জন্মে ভূমি ক্ষয় রোধ করে এবং উপকূলীয় বেষ্টনী হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মায়ের মতো সুরক্ষা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতে কেওড়া ফলের বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ (জ্যাম, জেলি, জুস, আচার) শুরু করা গেলে এটি দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি সম্ভব। এতে উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাড়তি আয়ের সংস্থান হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে।
শেখ মাহতাব হোসেন।
ডুমুরিয়া খুলনা।







