জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই রক্তস্নাত আকাঙ্ক্ষা যেন বৃথা না যায়, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আসুক এবং আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হোক—এমন জোরালো দাবি জানিয়েছেন জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মেধাবী তরুণদের যোগ্যতা ও মেধা বিকাশের উপযোগী পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘গণঅভ্যুত্থান-২০২৪’-এর দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল এবং ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় ‘ফ্যাসিবাদী সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বজনরা, যাঁদের বক্তব্যে ফুটে ওঠে আত্মত্যাগের লক্ষ্য, প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও প্রত্যাশা।
আলোচনা সভায় শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন তাঁর বক্তব্যে ১৬ই জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আমার ভাইকে অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই নৃশংসতাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর করে, যার ফলে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন নিশ্চিত করে।” বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুজ্জোহা যেভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ঠিক সেভাবেই শিক্ষার্থীদের সাহস ও উদ্দীপনা জুগিয়েছেন। স্বৈরাচারী সরকারের পতনে তাঁদের এই নিঃস্বার্থ সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে তিনি মনে করেন।
আবু হোসেন আরও উল্লেখ করেন যে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে এক পাল্লায় মাপা সম্ভব নয়। তবে এই ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে অর্জিত সেই অমূল্য স্বাধীনতাকে পুনরায় পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষিত করা। সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন স্তরে যে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের প্রবণতা দেখা গেছে, তা নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এ ধরনের অবমাননাকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিবাদ দেখা যায়নি। তিনি বর্তমান সরকারের কাছে আহ্বান জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অবমাননা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে। পরিশেষে তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বুক ফুলিয়ে বলতে পারে যে তারা আগের চেয়ে বর্তমান সময়ে অনেক ভালো আছেন—তবেই শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম তাঁর বক্তব্যে এক বাবার আকুলতা এবং আগামীর জন্য সতর্কবার্তা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “আমাদের সন্তানরা কিছু স্বপ্ন, আশা আর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। সেই পবিত্র আকাঙ্ক্ষা যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্ত না হয় এবং কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা ব্যক্তিগত লাভের কারণে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।” তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীরা কেবল মেধার মূল্যায়ন এবং ন্যায়ের দাবিতেই আন্দোলনে নেমেছিল। তাই দেশের প্রতিটি মেধাবী ছেলে-মেয়ের জন্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা তাদের মেধা ও যোগ্যতা স্বাধীনভাবে কাজে লাগাতে পারে।
শহীদদের হত্যার বিচার প্রসঙ্গে শফিউল আলম কিছুটা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব বেশি সময় অতিবাহিত হয়নি। সরকারকে কাজ করার পর্যাপ্ত সুযোগ এবং সহযোগিতা প্রদান করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, সরকারের কোনো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে দেশ সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, শহীদ মীর মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্যকে তিনটি প্রধান স্তম্ভে বিভক্ত করে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, এই তিনটি বিষয় হলো—ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল রূপান্তর এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচার। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “যদি কোনো একজন তরুণ সংসদ সদস্য পুরো একটি প্রজন্মের হয়ে কথা বলেন, তবে প্রশ্ন জাগে—কোন জাতীয় সম্মেলন বা গণভোটের মাধ্যমে তাঁকে এই বিশাল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?” আলোচনা ও সমালোচনার সুযোগ থাকলেও, একটি পুরো প্রজন্মের ওপর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়াকে তিনি এক ধরনের ‘নতুন ফ্যাসিবাদের’ লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেন।
স্নিগ্ধ আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় সিনিয়র রাজনীতিবিদদের নিয়ে যে ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা প্রত্যাশিত সংস্কৃতির সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই ধরনের আচরণ ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়েই দেখা যেত বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা এমন কোনো সংস্কৃতি চায়নি। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব কেবল সরকার বা সরকারি দলের নয়, বরং বিরোধী দলসহ দেশের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। “শহীদরা আমাদের ওপর থেকে দেখছেন”—এই কথাটি মনে রেখে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা নিয়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। বিশেষ করে শহীদ আনাসকে গুলি করা পুলিশ সদস্যের তিন বছরের সাজা এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাঁচ বছরের সাজাকে তিনি অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন। এই বিষয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। পরিশেষে তিনি বলেন, “দেশকে বদলাতে হলে প্রথমে নিজেকে বদলাতে হবে। আমরা যদি নিজেদের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনতে না পারি, তবে সামগ্রিকভাবে দেশকে পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম উপস্থিত থেকে আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক এবং ইউট্যাবের মহাসচিব অধ্যাপক মো. মোরশেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।








