রাজনীতির অঙ্গনে যার একটি ডাক হাজার হাজার মানুষকে একত্রিত করে, যার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লাইক আর লাভ রিঅ্যাক্টের জোয়ার বয়ে যায়, তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সমন্বয়ক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তবে সম্প্রতি তাঁর একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক অভাবনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক শ্রদ্ধার্ঘ্য পোস্টে এবার সমর্থনের বদলে উপহাসের ঢল নেমেছে।

নাহিদ ইসলাম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশ্বজনীন রূপকার হিসেবে অভিহিত করে গভীর শ্রদ্ধা জানান। কিন্তু জাতীয় নাগরিক পার্টির লোগো সংবলিত পোস্টারে এই চিরাচরিত রবীন্দ্র-বন্দনা করতে গিয়েই এক ভিন্নরকম ডিজিটাল ধাক্কা খেলেন এই তরুণ নেতা। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত দেখা গেছে, পোস্টটিতে মোট প্রতিক্রিয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ছাড়িয়ে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষই দিয়েছেন ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট, যা মোট প্রতিক্রিয়ার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ। অন্যদিকে, লাইক পড়েছে মাত্র পাঁচ হাজারের কিছু বেশি এবং লাভ রিঅ্যাক্ট আড়াই হাজারের কাছাকাছি। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে গিয়ে অনুসারীদের কাছ থেকে সমর্থনের বদলে উপহাসের তীরই বেশি হজম করতে হয়েছে নাহিদ ইসলামকে।

রিঅ্যাক্টের এই নেতিবাচক প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে কমেন্ট সেকশনে। সেখানে নেটিজেনদের ক্ষোভ এবং উপহাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তীব্রভাবে। ভারত রায় নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারী এবং ‘বিদেশী কবি’ আখ্যা দিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একইভাবে ইয়াসিন এইচ পিয়াস লিখেছেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে আজ তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন বিরোধিতাকারীকে বন্দনা করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ক্ষুব্ধ অনেক নেটিজেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ব্যঙ্গ করে ‘রঠা’ সম্বোধনসহ বিভিন্ন আক্রমণাত্মক ও অশ্রাব্য ভাষায় উপহাস করেছেন।

নাহিদ ইসলামকে সরাসরি খোঁচা দিয়ে মোহাম্মদ রিমন মল্লিক লিখেছেন, “অন্যান্য দিন লাভ আর কেয়ার রিঅ্যাক্ট পেলেও আজ জুটছে হা হা, অথচ ফলোয়ার কিন্তু একই।” অন্যদিকে, ‘লেটস চেঞ্জ বাংলাদেশ’ নামের একটি পেজ থেকে কটাক্ষ করে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের সমীকরণ জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্বকে মাথায় রাখতে হবে। মূলত, বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিগত সরকারের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে দেখছে, যা এই প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নাহিদ ইসলামের পেজের সাম্প্রতিক অন্যান্য পোস্টগুলোর সাথে এই ঘটনার তুলনা করলে বৈসাদৃশ্যটি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সাধারণত তাঁর যেকোনো রাজনৈতিক বার্তা বা সমসাময়িক বিষয়ে মত প্রকাশের পর অনুসারীরা ইতিবাচক সমর্থন জানায়। লাইক, লাভ রিঅ্যাক্টের পাশাপাশি কমেন্ট বক্সে প্রশংসার জোয়ার দেখা যায়। তাঁর পেজে নেতিবাচক মন্তব্যের এমন আধিক্য সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে দেওয়া এই পোস্টটির ক্ষেত্রে অনুসারীদের প্রতিক্রিয়া এবং মন্তব্যের ধরন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

রাজনীতির নতুন সমীকরণের পক্ষে থাকা তরুণ সমাজের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক বার্তার মধ্যে যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, নাহিদ ইসলামের এই পোস্টে আসা ‘হা হা’ রিঅ্যাক্টের ঝড় যেন তারই এক বাস্তব প্রতিফলন। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে সাংস্কৃতিক সংজ্ঞায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক বেশি সংবেদনশীল ও সমালোচনামূলক।