বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল কেবল স্বাদে অতুলনীয় নয়, বরং প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় এটি এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি অত্যন্ত উপাদেয় ফল হিসেবে পরিচিত। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যবর্তী সময়ে কাঁঠাল গাছে ফুল আসার প্রবণতা দেখা যায়, তবে জাতভেদে অমৌসুমী ও বারোমাসি গাছে সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ফলন আসা শুরু হয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় কাঁঠাল গাছ হলো একটি মনোসিয়াস বা সহবাসী উদ্ভিদ, যার অর্থ একই গাছে স্ত্রী ও পুরুষ পুষ্পমঞ্জরী পৃথকভাবে জন্মায়। একটি মঞ্জরীদণ্ডের ওপর বিপুল সংখ্যক ফুল গুচ্ছাকারে থাকে। কাঁঠালের এই পুষ্পমঞ্জরী মূলত একটি স্পাইক, যা দুটি নৌকার মতো আকৃতির স্পেদ বা খোলসের ভেতরে আবৃত থাকে। সময়ের সাথে সাথে এই স্পেদ ভেদ করে পুষ্পমঞ্জরী বাইরে বেরিয়ে আসে।

সাধারণত গাছের মূল কাণ্ড বা পুরাতন ডালের ফুটস্টকে স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরী এবং শাখা-প্রশাখায় পুরুষ পুষ্পমঞ্জরী জন্মায়। এখানে ফুটস্টক বলতে গাছের কাণ্ড বা ডাল থেকে উৎপন্ন সেই বোটার মতো অংশটিকে বোঝানো হয়, যেখান থেকে কাঁঠালটি ঝুলে থাকে। ফুল ও ফল ধারণের মৌসুমে গাছে গাছে এই পুরুষ ও স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরীর সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়। স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরী আকারে পুরুষ পুষ্পমঞ্জরীর তুলনায় দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বেশ বড় হয়। এর গায়ে হালকা হলুদ বিন্দুর মতো ছোট ছোট স্টিগমা দেখা যায়, যার সংখ্যা দুই থেকে তিন হাজার পর্যন্ত হতে পারে। এই স্টিগমাগুলোর সজীবতা বা পরাগরেণু গ্রহণের ক্ষমতা এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ত্রীফুল যত বেশি পরাগায়িত হবে, কাঁঠালের কোষ তত বেশি বৃদ্ধি পাবে এবং ফলটি আকারে বড় ও পুষ্ট হবে। স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরীর বোটা বেশ মোটা হয় এবং এর গোড়ায় রিং-এর মতো বিশেষ দাগ থাকে। অন্যদিকে, পুরুষ পুষ্পমঞ্জরী তুলনামূলক ছোট, এর বোটা চিকন এবং উপরিভাগ মসৃণ হয়। এ্যানথার বিদারণের সময় এখান থেকে হালকা হলুদ পাউডারের মতো দানা তৈরি হয়, যা থেকেই পরাগরেণু নির্গত হয়। একটি পুষ্পমঞ্জরীতে প্রায় এক কোটিরও বেশি পরাগরেণু উৎপন্ন হয়, যা সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন সজীব থাকে।

কাঁঠালের পরাগায়ন প্রক্রিয়া মূলত বায়ুর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ এটি একটি বায়ু পরাগী ফল; এখানে পোকামাকড়ের কোনো ভূমিকা থাকে না। তবে প্রাকৃতিক পরাগায়নের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে কৃত্রিম পরাগায়নের মাধ্যমে ফলন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। সঠিক সময়ে ভিন্ন গাছের সজীব পরাগরেণু ব্যবহার করে পরাগায়ন নিশ্চিত করলে কাঁঠালের আকার বড় হয় এবং অপুষ্টিজনিত কারণে ফলের গায়ে যে এবরোথ্যাবরো বা অসমতা দেখা দেয়, তা অনেকাংশে কমে যায়। আম বা লিচুর মতো ফলের ক্ষেত্রে ফুল আসার আগে খরার প্রয়োজন হলেও কাঁঠালের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। বরং এই সময়ে সেচের প্রয়োজন হয়। স্টিগমার গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে, পরাগরেণুর সজীবতা ধরে রাখতে এবং ফল ঝরা রোধ করতে নভেম্বর মাস থেকে প্রতি ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর সেচ দিলে ফুল ধারণ বৃদ্ধি পায় এবং ফলন স্থিতিশীল হয়।

গাঠনিকভাবে কাঁঠালের স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরী বিপুল সংখ্যক স্বতন্ত্র স্ত্রী ফুল নিয়ে গঠিত হওয়ায় একে যৌগিক বা মাল্টিপল ফল বলা হয়। যেহেতু কাঁঠাল গাছ পরপরাগী, তাই বীজ থেকে উৎপন্ন গাছের মাতৃগুণ সবসময় বজায় থাকে না। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে এবং কাঁঠালের আকার বড় ও সমান করতে কৃত্রিম পরাগায়ন অত্যন্ত কার্যকর। এর জন্য অন্য গাছের উপযুক্ত পুরুষ পুষ্পমঞ্জরী থেকে পরাগরেণু সংগ্রহ করতে হয়। যখন এ্যানথার হালকা হলুদাভ রং ধারণ করে এবং হাতে ঘষলে সহজে পরাগরেণু বের হয়, তখন তুলির সাহায্যে তা সতর্কতার সাথে স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরীর গায়ে লাগিয়ে দিতে হবে। এছাড়া সম্পূর্ণ পুরুষ পুষ্পমঞ্জরীর বোটা ধরে স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরীর গায়ে ঘষলেও পরাগায়ন সম্পন্ন হয়। স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরীর গায়ে স্টিগমা বের হওয়ার প্রথম সপ্তাহ থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে দু-এক দিন পর পর মোট তিনবার কৃত্রিম পরাগায়ন করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। এই কাজের জন্য সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে উপযোগী। যদি কোনো কারণে পুষ্পমঞ্জরীতে অপুষ্টতা বা এবরোথ্যাবরো ভাব দেখা দেয়, তবে ০.২% বোরন গাছের পাতা ও শাখা-প্রশাখায় স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়।