ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকের নির্মম মারধরে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হোমওয়ার্ক না করার অপরাধে শিক্ষকের থাপ্পড় ও বেত মারের শিকার হয়ে প্রাণ হারাল ওই নিষ্পাপ শিশুটি। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তির দাবি উঠেছে।
মৃত শিশুটির নাম প্রণয় তেজা। তার স্বজনদের দেওয়া তথ্যানুসারে, হোমওয়ার্ক শেষ না করায় শিক্ষক তাকে প্রথমে থাপ্পড় মারেন এবং পরবর্তীতে বেত দিয়ে প্রচণ্ড মারধর করেন। এই শারীরিক নির্যাতনের তীব্রতায় প্রণয় হঠাৎ করেই অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দ্রুত তাকে স্থানীয় কিং জর্জ হাসপাতালে (কেজিএইচ) নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিশাখাপত্তনমের ওয়ান টাউন এলাকার ‘লিটল গার্ডেন স্কুল’ নামের একটি বেসরকারি স্কুলে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। বর্তমানে রাজ্য পুলিশ ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে জড়ো হয়ে শোক প্রকাশ করেন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হন। প্রণয়ের পরিবারের দাবি, বৃহস্পতিবার সকালে সে সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে এবং হাসিখুশি মনে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। তার বাবা অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করে বলেন, "সকাল ৮টার দিকে আমার ছেলে ঘুম থেকে উঠে নিজেই স্কুলে যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছিল। প্রথমে আমরা তাকে সঙ্গে সঙ্গে পাঠাতে চাইনি, কিন্তু সামনেই পরীক্ষা থাকায় শেষ পর্যন্ত আমরা রাজি হই। সে বলেছিল, ‘ঠিক আছে বাবা, আমি স্কুলে গেলাম’ এবং সে খুশিমনে স্কুলে চলে গিয়েছিল।"
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় প্রণয়ের মধ্যে অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর তারা এক ভয়াবহ সংবাদের মুখোমুখি হন। শিশুটির বাবা জানান, দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে তিনি একটি ফোন কল পান এবং জানতে পারেন যে তার ছেলের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই খবরটি তাকে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানানো হয়নি। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, "স্কুল থেকে কেউ আমাকে ফোন করে কিছু জানায়নি। আমার শ্যালকের কর্মস্থলের পাশে থাকা স্থানীয় কয়েকজন বাবুর্চি আমাকে ফোন করে বিষয়টি জানান।"
পরিবার যখন কিং জর্জ হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন তাদের জানানো হয় যে প্রণয় আগেই মারা গেছে। স্কুলের ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল তা জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ তাদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখায়। পরিবারের দাবি, সেই ফুটেজে পরিষ্কার দেখা গেছে যে শিক্ষক শিশুটিকে ভয় দেখাচ্ছিলেন এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করছিলেন। আতঙ্কে এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণায় প্রণয় সেখানেই লুটিয়ে পড়ে। একজন চিকিৎসক তাদের জানিয়েছেন, হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রায় আধা ঘণ্টা আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল।
এনডিটিভির সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শিক্ষক শিশুটিকে মারধর করছেন এবং এর কিছুক্ষণ পরেই শিশুটি ওই শিক্ষকের কোলে ঢলে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার আগে ছেলে অসুস্থ ছিল কি না—এমন সব জল্পনা ও ধারণা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রণয়ের বাবা। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তার ছেলের আগে থেকে কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল না। গত রাতে সে আনন্দের সাথে খেলাধুলা করেছে এবং সকালে সুস্থভাবেই ঘুম থেকে উঠেছে। তার কোনো ভাইরাল জ্বর বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা ছিল না।
পরিবারের আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এই স্কুলে শারীরিক শাস্তির ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। তাদের দাবি, এখানে নিয়মিত অন্য শিশুদেরও মারধর করা হয়। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারা স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হন রাজ্যের রেভিনিউ ডিভিশনাল অফিসার (আরডিও) দিলীপ চক্রবর্তী। তিনি জানান, স্কুল থেকে একটি ৬ বছর বয়সী শিশুকে মৃত অবস্থায় কেজিএইচ-এ আনা হয়েছে এবং সরকারি প্রশাসন এই ঘটনার সব বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। এই ঘটনায় পুলিশ একটি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে এবং মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। সূত্র: এনডিটিভি।










