রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালীর বিভিন্ন নামি-দামি রেস্তোরাঁয় ‘ডোরি মাছ’ হিসেবে যে খাবারটি পরিবেশন করা হচ্ছে, তা আসলে সাধারণ পাঙাশ মাছ। সম্প্রতি এসব এলাকার মোট নয়টি রেস্তোরাঁ থেকে সংগৃহীত নমুনার ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এই চমকপ্রদ ও উদ্বেগজনক তথ্যটি সামনে এসেছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রাকেব-উল-ইসলামের এক বিশেষ অনুসন্ধানী গবেষণায় এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
গবেষণার বিস্তারিত তথ্যে জানা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী—এই তিন জেলার মোট নয়টি রেস্তোরাঁ থেকে ‘ডোরি মাছ’ হিসেবে পরিবেশিত খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রতিটি জেলা থেকে অন্তত তিনটি করে নমুনা নেওয়া হয়। সংগৃহীত নমুনাগুলো থেকে পরবর্তীতে ডিএনএ পৃথক করা হয় এবং পিসিআর (PCR) পরীক্ষা ও ডিএনএ সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছের প্রকৃত প্রজাতি শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, সংগৃহীত নমুনাগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্য ‘Pangasianodon hypophthalmus’ প্রজাতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এই প্রজাতিটি বাংলাদেশে সাধারণত চাষের পাঙাশ বা থাই পাঙাশ নামে পরিচিত।
মাছের প্রজাতি শনাক্তকরণ, পপুলেশন জেনেটিক্স, ফিশ ইকোলজি, জলজ জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছেন ড. রাকেব-উল-ইসলাম। তিনি জানান, প্রায় ছয় মাস আগে দেশে ডোরি মাছ আমদানি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পড়ার পর তিনি বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপরই তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এই পরীক্ষাটি পরিচালনা করেন। তবে গবেষণার গোপনীয়তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বিবেচনা করে রেস্তোরাঁগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ড. রাকেব-উল-ইসলামের মতে, মাছ যখন ‘ফিলে’ বা প্রক্রিয়াজাত অবস্থায় পরিবেশন করা হয়, তখন সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে সেটি কোন প্রজাতির মাছ, তা শুধু দেখে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। কারণ ফিলে করার পর মাছের চামড়া, মাথা, কাঁটা কিংবা প্রজাতি শনাক্ত করার মতো অন্যান্য বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে না। ফলে এক প্রজাতির মাছ অন্য নামে পরিবেশন করা হলে ক্রেতা তা বুঝার সুযোগ পান না এবং সহজেই বিভ্রান্ত হন। আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ডোরি’ নামে পরিচিত মাছগুলোর মধ্যে ‘জন ডোরি’ অন্যতম। এই মাছের দেহ চ্যাপ্টা এবং শরীরে বিশেষ গোলাকার দাগ থাকে, যার ফলে আস্ত অবস্থায় মাছটি শনাক্ত করা সহজ। কিন্তু ফিলে আকারে বিক্রি বা পরিবেশন করা হলে এই বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে যায়, যা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
গবেষণায় আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে ছোট আকারের পাঙাশ মাছকে ‘নদীর টেংরা’ মাছ হিসেবে পরিবেশন করে ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে। ড. রাকেব-উল-ইসলাম মনে করেন, মাছের প্রকৃত প্রজাতি গোপন রেখে ভিন্ন নামে বিক্রি করা কেবল ক্রেতার আর্থিক ক্ষতিই করে না, বরং খাবারের সঠিক পরিচয় জানার মৌলিক অধিকারকেও খুণ্ণ করে। এ কারণে বাজার ও রেস্তোরাঁগুলোতে মাছের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা এবং কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি জোর দিয়ে বলেন।


















