জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মাদরাসা শিক্ষার ফলাফলে দেশের শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছে দারুন্নাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসা। ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায়ও সেই ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় ঘটেনি—বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের গল্প। সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ১ হাজার ২৯৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১৭ জন প্রাথমিক তুলনামূলক চিত্রে যা দেশের মাদরাসাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এবার দারুন্নাজাত থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ হাজার ২৯৯ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ২৬৮ জন, অকৃতকার্য মাত্র ৩১ জন পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৯৭ দশমিক ৬১ শতাংশে। আরও লক্ষণীয় বিষয়, মোট পরীক্ষার্থীর নিরিখে জিপিএ-৫ অর্জনের হার ৪৭ দশমিক ৫০ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৪৮ জনই ছুঁয়েছে সর্বোচ্চ ফল।
এই সাফল্য নিছক সংখ্যার আধিক্য নয়, বড় পরীক্ষার্থীসংখ্যার মধ্যেও তা টিকিয়ে রাখা একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। প্রতিষ্ঠানের চারটি শাখার মধ্যে তিনটিতেই এসেছে শতভাগ পাসের সাফল্য। দারুন্নাজাত তাখসিসি শাখায় ১২৭ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯৬ জন। দারুন্নাজাত মাদ্রাসা কিতাব বিভাগে অংশ নেওয়া ৭১ জনের সবাই যেমন উত্তীর্ণ হয়েছে, তেমনি তাদের মধ্যে ৬১ জনই অর্জন করেছে সর্বোচ্চ ফল। দারুন্নাজাত আইডিয়াল শাখাতেও ৮৭ জনের সবাই কৃতকার্য, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫১ জন।
জিপিএ-৫ অর্জনকারী ৬১৭ জনের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ২৯৭ জন, সাধারণ বিভাগের ৩২০ জন। অর্থাৎ সাধারণ বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের তুলনায় ২৩ জন বেশি। শতাংশের হিসাবে মোট জিপিএ-৫ অর্জনকারীর ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ সাধারণ বিভাগের এবং ৪৮ দশমিক ১৪ শতাংশ বিজ্ঞান বিভাগের।
এই সাফল্যের নেপথ্যের কারণ জানতে চাইলে দারুন্নাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ আলহাজ মাওলানা আবুল খায়ের মুহা. আবু বকর সিদ্দীক বলেন, 'দ্বীনি পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অধ্যবসায়, গভর্নিং বডির দক্ষ পরিচালনা ও শিক্ষকদের কর্তব্যনিষ্ঠা এসবই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার অশেষ রহমত, যা ছাড়া এই অর্জন সম্ভব হতো না।'
একই সুরে কথা বলেন প্রতিষ্ঠানের কিতাব বিভাগের উপাধ্যক্ষ মাওলানা ফরিদ বিন আব্দুল আওয়াল। তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম, শিক্ষকদের আন্তরিক তত্ত্বাবধান ও নিবিড় পরিচর্যা এই ফলাফলের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। আর সবার আগে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহেই আজকের এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।'
প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষ শিক্ষকের এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে একটি অভিন্ন সুর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণাকেই তাঁরা মনে করছেন এই ধারাবাহিক সাফল্যের প্রকৃত রহস্য।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যে, এই ফলাফল দারুন্নাজাতের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সাফল্যেরই সম্প্রসারণ। প্রায় এক যুগ ধরে মাদরাসা শিক্ষার ফলাফলে দেশের প্রথম বা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার দাবি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বরাবরই করা হয়ে আসছে। এবারের ৬১৭ জনের জিপিএ-৫ সেই দাবিকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
বড় পরীক্ষার্থীসংখ্যা, প্রায় ৯৮ শতাংশ পাসের হার এবং ৬১৭ জনের জিপিএ-৫—এই তিন সংখ্যাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় দারুন্নাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসার সাফল্যের মূল চিত্র। শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, শিক্ষকদের নিষ্ঠা আর প্রতিষ্ঠানের সুশৃঙ্খল পরিচালনার মিশেলে দীর্ঘদিনের অর্জিত অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার ইঙ্গিত দিয়েই যেন এবারের ফল সামনে এলো।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর






